পশুপক্ষীকে কাল্পনিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে উপস্হাপনায় ভারতের জনপ্রিয় গণমাধ্যম

পৃথ্বী সেনগুপ্ত,স্বাধীন গবেষক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

Download PDF Version

 সারাংশ 

পশু-পাখী তথা অন্যান্য জীব-প্রজাতি সম্বন্ধে নানান ধরণের গবেষণা, চর্চা পৃথিবীর নানান দেশে বিস্তৃত সময়কাল ধরেই চলে আসছে। এর সাথে যখন জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমের প্রসঙ্গ যুক্ত হয়, তখন তা আর পৃথক বস্তু না থেকে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো এবং তার সাথে যুক্ত আরো নানান উপাদানের সাথে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে সম্পৃক্তও হয়ে যায়। তাই সততার সাথে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী লেখার ক্ষেত্রে বজায় রাখাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে-ও পশুপাখী জগতের কাল্পনিক উপস্হাপনায়, মাধ্যম ব্যবস্হা মূলত এই সময়ে কিভাবে কাজ করছে ভারতে তা আলোচনা করতে গিয়ে পশুপাখীর নিজস্ব চারিত্রিক-মানসিক এবং শারীরিক বিষয়গুলি সম্বন্ধে প্রাথমিকভাবেই আলোচনা করা হয়েছে। ভারতের প্রেক্ষিতে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমগুলি কাল্পনিক চরিত্রের সাহায্যে পশুপাখীকে কিভাবে তুলে ধরছে নিজ-নিজ কর্ম-বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে, তার ফলে আমাদের বা সার্বিকভাবে সমাজের, এই সময়ের সাধারণ মানুষ, দর্শক বা পাঠক, বিশেষ করে এগুলির টার্গেট-অডিয়েন্স, শৈশব প্রজন্মের মানসিক চিন্তাভাবনায় কি পরিবর্তন হচ্ছে বা তার কী ধরণের সম্ভাবনা রয়েছে, এবং এর ফলে সার্বিকভাবেই পৃথিবীর ক্ষেত্রে জীবকুলের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তার একটা চিত্র-নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। তাছাড়াও সীমিত পরিসরের বাইরে যা এখানে আলোচনা করা সম্ভব হল না, সেক্ষেত্রে-ও পরবর্তী সময়ে কি-কি গবেষণা করা যেতে পারে সে সম্বন্ধে প্রবন্ধের শেষে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মানুষ, পশুপাখীর সার্বিক জগতের বিষয়টি দেশ-কালভেদে মোটামুটিভাবে একটি অপরিবর্তনীয় উপাদান বা বলা যায় মাধ্যম ব্যবস্হার মানুষের ক্ষেত্রে প্রভাবের সার্বিক বিষয়টি মোটামুটিভাবে একই বলে ধরা হয়েছে। তবে যেহেতু আমরা ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধার্মিক প্রভৃতি জিনিসের প্রেক্ষিতে এই সময়ের মাধ্যমের কথা-ই এখানে আলোচনা করছি তাই মানুষের মানসিক চিন্তা-ভাবনার বিষয়টি ভারতের চিত্রকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। সীমিত পরিসরে কিছু বাদ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নিয়েই তথ্য, সমীক্ষা, মতামত এবং বিশ্লেষণভিত্তিক এই প্রবন্ধ নির্মাণের উদ্দেশ্য একটাই – মূল আলোচনা যাতে গুরুত্ব সহকারে বাস্তব চিত্রকে যেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে সু্স্পষ্টভাবেই তুলে ধরতে পারে।

 প্রবন্ধের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং কৌশলগত দিক:

প্রবন্ধ শুরুর আগে তিনটি (৩) নির্দিষ্ট যে দিক, যার ওপর দাঁড় করিয়ে পুরো বিষয়কে নিয়ে-ই কাঠামোকে গড়ে তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করাটা অত্যন্ত দরকার। এর থেকে রচনার উদ্দেশ্যটাও আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে উঠবে।

প্রথমত, পশুপক্ষীর বিস্তৃত জগতের বিভিন্ন দিককে গণমাধ্যমের ‘কাল্পনিক’ উপস্হাপনা – এই দিকটিকেই প্রবন্ধে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, মাধ্যমের যে সমস্ত ক্ষেত্রে সমাজবদ্ধ বুদ্ধিমান জীব হিসেবে মানুষের সাথে পশু এবং পাখীকে অভিনয় করতে বা উপস্হিত থাকতে দেখা গেছে, বাস্তবের রক্ত-মাংসে গড়া জীবন্ত এই চরিত্রগুলিকে এই আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। এর কারণ মূলত একটাই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে-ই তাতে কল্পনার জায়গায় তাকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই নমনীয় বিষয়টির পরিসর অনেক কম। এবং একইসাথে মাধ্যমের মোট সম্প্রচার সময়, মোট মুদ্রণমাধ্যমে জায়গা করে নেওয়া তথা মোট মূল উপস্হাপনার সংখ্যা ও গুণমানের দিক থেকে দেখতে গেলে বাস্তবিক চরিত্র এবং কাল্পনিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমে পশু-পাখী জগতের উপস্হাপনার মধ্যে ফারাক অনেকটা-ই বেশি। এখানে তাই মূল আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় হল পশুপাখীর জগতের কাল্পনিক প্রকাশ, যা কার্টুন ও কমিকসের মধ্য দিয়েই সবচেয়ে বেশী করে শুধু সম্ভবপর-ই নয়, তাতে মাধ্যমব্যবস্হাগুলির-ও চূড়ান্ত স্বাধীনতা উপভোগের পর্যায়টি-ও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যা পশুপাখীর নিজস্ব চারিত্রিক জগতের দিক থেকে আলোচনা করলে প্রবন্ধের তাৎপর্য্যের শিকড়-ও অনেক সুগভীরে ছড়িয়ে পরে।দ্বিতীয়ত, আলোচনার সময়কালের ক্ষেত্রে মোটামুটিভাবে নির্দিষ্ট কোনো সময়কালের কথা না বলা হলে-ও আমরা গণমাধ্যম বিকাশের সার্বিক চূড়ান্ত সময় এই শতকেই ধরে নিচ্ছি। এবং তৃতীয়তঃ, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্হানের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীকে না নিয়ে বরং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারতবর্ষের মাধ্যম ব্যবস্হাগুলির এক্ষেত্রে কার্যকলাপ-এর বিষয়টি প্রধান স্হান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আজকের বিশ্বে মাধ্যমব্যবস্হা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’(১) -এ পরিণত করেছে সারা বিশ্বকেই। কিন্তু সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রত্যেকটি দেশের মাধ্যম ব্যবস্হা যখন অন্য দেশের জন্য কোনো অনুষ্ঠান সেই দেশের সম্প্রচারবিধিকে মেনে নিয়েই তাদের বাণিজ্যিক লাভের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত করে, তখন ভৌগোলিকভাবে দেশ বিভিন্নতায় তাঁর প্রচুর পরিবর্তন হয় এবং সেটা স্বাভাবিক-ও। ফলে ভারতের জন্য তৈরী পশুপাখীর নির্দিষ্ট কার্টুন-সিরিয়াল-চলচ্চিত্রগুলি যে ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্যান্য দেশের মতো হবে না বা তার থেকে অনেকটাই আলাদা হবে সেকথা সহজবোধ্য। যদি-ও বর্তমানে, মূল বিষয়কে এক রেখে তার ভাষাগত পরিবর্তন করা হচ্ছে বা সংগীত-এর ক্ষেত্রে ভারতের জনপ্রিয় বহুল প্রচারিত সংগীত ব্যবহার করা হচ্ছে,  তাকে আরো-ও আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য। কিন্তু তা সত্ত্বে-ও বলতে হয় বেশ কিছু অনুষ্ঠান আছে যেগুলো খুব নির্দিষ্টভাবেই নির্দিষ্ট দেশে-ই জনপ্রিয়। তার সম্প্রচার এখানে সাময়িকভাবেই হচ্ছে, কারণ তা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে না, তা স্বাভাবিক-ও। সেইজন্য-ই ‘গ্লোবাল ভিলেজে’-র বিষয়টি মাথায় রেখে-ই অন্যান্য দেশগুলির জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম এই ধরণের অনুষ্ঠান কীভাবে করছে তা নিয়ে আলোচনা করাটা সময়সাপেক্ষ-র সাথে গবেষণার উৎকর্ষতা, তথ্যের প্রাচুর্য্যতা, নিরপেক্ষতা প্রভৃতি বিষয়গুলির যাতে কোনোরকম মানের ঘাটতি না হয় তার দিকে-ও খেয়াল রেখে ভারতের অবস্হাকে-ই এখানে শুধু তুলে ধরা হয়েছে। তাই জন্যেই এখানে আমরা নির্দিষ্টভাবে ভৌগোলিক বিষয়টাকে ভারতের সম্প্রচারবিধি আইন এবং পশুপাখী সংক্রান্ত আইন-নিয়মকানুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছি। আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে অবশ্য ব্যাতিক্রম কিছু ঘটতে পারে। তবে তা প্রবন্ধের উৎকর্ষতা বাড়ানোর কথা মাথায় রেখে-ই।

সর্বোপরি, আরেকটি বিষয়কে-ও এখানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম হিসেবে আমরা খুব সাধারণভাবে কি বুঝি-বিশেষ করে যখন ‘জনপ্রিয়’ অর্থাৎ সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে এবং তা ‘বিনোদন’ করছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফলতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে এই ধরণের মাধ্যমগুলির প্রসঙ্গ-ই এখানে জোরালো হয়ে উঠছে।

মূলত এই বিষয়টিকে খেয়াল রেখে তিন ধরণের মাধ্যমকে আলোচনায় রাখা হয়েছে। এগুলি হলো ১. চলচ্চিত্র বা অ্যানিমেশন সিনেমা, ২. টেলিভিশনে বা দুরদর্শনে দেখানো কার্টুন- অ্যানিমেশনের প্রোগ্রাম বা অনুষ্ঠান ও সিরিয়াল এবং ৩. কমিকসের বই বা কার্টুন বই, অবশ্যই যেখানে পশুপাখী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রয়েছে। এগুলি সব-ই পূর্বে উল্লেখিত ভারতের ক্ষেত্রে ধরে-ই আলোচনা করা হবে। একইসাথে সমস্তক্ষেত্রে-ই ভারতে যা-যা কাজ হচ্ছে তার দিকেই আলোচনা কেন্দ্রীভূত থাকবে। যে কারণে উপরে উল্লেখিত মাধ্যমগুলির কথা বলা হল ঠিক একই কারণে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইট, রেডিও এবং সংবাদপত্র, এবং অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় মাধ্যমগুলি অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। মূলত বিনোদনমূলক জনপ্রিয় গণমাধ্যম হিসেবে সর্বস্তরের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে তা পৌঁছোনোর ক্ষমতা তথা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক-সামাজিক-শিক্ষা-সংস্কৃতি-মাধ্যম ব্যবস্হার পরিকাঠামো প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে এই সময়ের প্রেক্ষিতে রাখা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শহর এবং গ্রামাঞ্চল এই দু’ভাগে টার্গেট অডিয়েন্সের বিষয়টি (মাধ্যম ব্যবস্হার আলোচনায় ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ) ভাগ না করে মোটামুটি সাধারণ গ্রাহ্য তথ্য এবং মতামতকেই নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রবন্ধ রচনাটির উদ্দেশ্যটি হলো পশুপাখীর বাস্তব জগৎ, তাদের সমাজে অবস্হা, তাদের মানসিক বিষয়, তাদের শারীরিক বিষয়, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রভৃতির যা প্রকৃত রুপ তা কি আদৌ আমাদের গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে। হলে তা কীভাবে, কতটা? আর যদি না হয় তাহলে কী দেখানো হচ্ছে; সম্প্রচারিত হচ্ছে গণমাধ্যমে? (গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে বিনোদন ও জনপ্রিয় বিষয়টির প্রযোজ্যতা অনেক বেশী যথার্থ্য বলে মাধ্যমের বদলে গণমাধ্যম শব্দটি আমরা সাধারণভাবে বেশী এখানে ব্যবহার করবো) । একইসাথে গণমাধ্যম যারা পরিচালনা করছেন তারা কী ভাবছেন-টার্গেট অডিয়েন্স কারা এবং তারা কী ভাবছে এই বিষয়গুলি দেখার পর। বুদ্ধিমান উন্নত জীব হিসেবে এই পশুপাখীর নিজস্ব জগৎ সম্পর্কে আমাদের কী চিন্তা-ভাবনার জন্ম হচ্ছে? বাস্তবের সাথে কল্পনার তফাৎ কতটা? সবচেয়ে বড় কথা সামগ্রিক এই চিন্তা-ভাবনার ফলে আমাদের এবং এই পৃথিবীর ভালো না খারাপ হচ্ছে সার্বিকভাবেই-এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর জানবার একটা যথাসাধ্য প্রচেষ্টার জন্য-ই প্রবন্ধটি লেখা।

প্রবন্ধটির গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি তথা নির্মাণের কৌশল প্রসঙ্গে বলতে হয় অত্যন্ত পরিবর্তনশীল একটি বিষয় এই গণমাধ্যম। ফলে বিভিন্ন সূ্ত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করার থেকে-ও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় তথ্য এবং মতামতের নির্ভরশীলতার বিষয়টি। সর্বোপরি, ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়ের গবেষণার কাজ খুব কম এবং বর্তমানে-ও তা অত্যন্ত ধীরগতির (সুনির্দিষ্টভাবে-ই এই প্রবন্ধের বিষয় এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে)। কারণ আমাদের সামগ্রিক বর্তমান অবস্হা এতটাই দ্বান্দ্ধিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে সেখানে পশুপাখীর বিষয়ে মাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গীর দিকটি সম্বন্ধে খুব বেশি তথ্য সংকুলান করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আশার কথা এই যে ধীরে হলে-ও সচেতনতা গড়ে উঠছে সমাজের সর্বস্তরে-ই। প্রবন্ধের নির্মাণ কৌশলে তাই নিজস্ব আবেগ-পক্ষপাতিত্বের জায়গাকে যতটা সম্ভব বর্জিত করে অধিকাংশ তথ্য-মতামত জোগাড় করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোর আগে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীনের জায়গার স্হলাভিষক্ত না করা হয়। বক্তব্য-বিরুদ্ধ সমালোচনা-মতামত-ভিন্ন তথ্য-সংখ্যা-পরিসংখ্যান এগুলির ভারে মূল বিষয়বস্তুর সূক্ষ অথচ প্রয়োজনীয় অনুভূতির জায়গাগুলো যাতে চাপা না পড়ে যায় তার দিকে-ও দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমব্যবস্হায় পশুপাখীর মতো বিষয়কে উপস্হাপনায় ভারতীয় বিধিনিষেধ:

সংবিধানের 19 (1) (a) ধারা অনুযায়ী মত প্রকাশের ও বাক্-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে গণমাধ্যম যাতে স্বাধীনভাবে দেশের তথা সমাজের ‘Fourth Estate’ হিসেবে কাজ করতে পারে তার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে সরাসরিভাবে প্রাণী জগতের উপস্হাপনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে এখনো পর্যন্ত কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। সার্বিক বিধিনিষেধ হিসেবে আপত্তিকর, সামাজিক মূল্যবোধ, অশোভন বিষয়, হিংসা এই সমস্ত বিষয় থেকে প্রেসকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অবশ্য পশুপাখীর ব্যবহারের বিষয়ে কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারের এবং অন্যান্য সংস্হার তরফ থেকে, প্রযোজনা সংস্হার কাছে। এগুলি মূলত বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ হিসেবে চলচ্চিত্র শুরুর প্রথমেই ঘোষণা করে দেখাতে হবে। অনেকসময় আইন, সংস্হা, নিয়ম-মেনে চলা এসবের প্রশ্নে আমাদের দেশের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক বিতর্ক-ই বেশী দেখা যায়। আবার মাধ্যম পরিচালনা ব্যবস্হার নীতিভেদে কোন-কোন বিষয়কে কিভাবে দেখানো হবে তারও অনেক পরিবর্তন ঘটে। ফলে অনেক সময়-ই স্ব-আরোপিত নিয়মাবলীকেই নীতির প্রশ্নে মাধ্যমব্যবস্হাগুলি তাদের কাছে বেশি করে আঁকড়ে ধরে থাকে।

বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মতামত সংগ্রহ, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ব্যবহার পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। ফলে এর মধ্যে দিয়ে অনেকেই নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন। এই মতামতের মাধ্যমে সমীক্ষা করে অনুষ্ঠানের-ও আঙ্গিক বদলানো হয় কিংবা বিতর্ক থাকলে কোনো বিষয়ে তখন তা বাদ দেওয়া হয়, বা সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়। প্রসঙ্গত এটা মাথায় রাখা দরকার যে গণমাধ্যম ব্যবস্হার ক্ষেত্রে ভারতে, ভারত সরকার দ্বারা পরিচালিত দুরদর্শন চ্যানেল এবং রেডিও চ্যানেল বা কেন্দ্রগুলির অনুষ্ঠান পুরোপুরিভাবেই সরকারের নিয়ম-নীতি, অনুষ্ঠান উপস্হাপনা বিধি মেনে চলে।

চলচ্চিত্র, দুরদর্শন বা টেলিভিশন এবং কার্টুন-কমিকসের মতো মাধ্যমব্যবস্হায় পশুপাখী জগতের কাল্পনিক উপস্হাপনা:

আলোচনার শুরুর আগে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম বলতে কি বুঝি তা একবার সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করে নেব।

বিখ্যাত মাধ্যম বিশেষজ্ঞ ডেনিস ম্যাকওয়েল (২) -র মতে গণজ্ঞাপন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা জটিলতার সাথে সম্পন্ন হয় এবং বিশাল সংখ্যক মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে। দর্শক বা গ্রাহকরা সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ হয়ে থাকেন, যারা জটিল পরিস্হিতি তথা বিশাল সংখ্যক ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ হয়েও বিষয়বস্তু সংগ্রহ করেন। স্বভাবতই তথ্য বা বিষয়বস্তু থাকে সবার জন্য উন্মুক্ত এবং তার বন্টন নিকটবর্তী, অসংগঠিত এবং অপরিচিত ব্যাক্তিদের মধ্যে সমানভাবে হয়। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতামুক্ত এই ধরণের প্রক্রিয়ায় সাধারণভাবে গ্রাহকদের সাথে প্রেরকের একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে যাদের পরিচিতি মূলত তাদের কর্মসূচী বা তাদের ভূমিকা দ্বারা অনুমোদিত করা হয়। অর্থাৎ গণজ্ঞাপনের এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধরেই আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি যে জনপ্রিয়-বিনোদনমূলক মাধ্যম হল যেখানে মাধ্যমব্যবস্হাগুলি মূলত জনপ্রিয়তা অর্জনের দিকে লক্ষ্য রেখে বিনোদনমূলক কিছু উপস্হাপনা করছে তার দর্শক-পাঠক বা টার্গেট অডিয়েন্সের সামনে। এখানে অবশ্যম্ভাবীভাবেই বেশী করে মুনাফা অর্জনটাই লক্ষ্য। তবে দেশ-কাল ভেদে নীতি-নৈতিকতার তা প্রাসঙ্গিকতাবর্জিত নয়।

চলচ্চিত্র: ‘BAL GANESH’, ‘DELHI SAFARI’ (2012), ‘HANUMAN’ (2005), ‘JUMBO’ (2008), ‘GATTOTKACH’ (2004), ‘KRISHNA’ (2006), ‘O FABY’ (1993, MALAYALAM), ‘RETURN OF HANUMAN’ (2007), ‘ROADSIDE ROMEO’ (2008), ‘TOONPUR KA SUPERHERO’ (2010), ‘THE GREEN CHIC-FINDING DAD’ (PETA AWARDED), ‘MY FRIEND GANESHA’ (পুরস্কারপ্রাপ্ত), ছোটা ভীমের কিছু সিনেমা, প্রভৃতি সিনেমার নামগুলির কথা এক্ষেত্রে বলা যায়, যা ভারতীয় প্রযোজনা সংস্হার মাধ্যমে মূলত নির্মিত হয়েছে (কিছু ক্ষেত্রে আংশিক বিদেশী প্রযোজনা বা কার্যকলাপ যুক্ত) । এবং এগুলি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ভারতীয় মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মতোই। তবে হিন্দি বা ইংরেজী ছাড়াও কিন্তু অনেক অ্যানিমেশন ছোটো বা বড় অনেক চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র রয়েছে যেগুলি বাংলা এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায়-ও নির্মিত হয়েছে। এখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে পশুপাখীর কাল্পনিক উপস্হাপনার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। কিছু-কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব চরিত্রে অভিনীত মানুষের সাথে পশুপাখীর অ্যানিমেশনের সংমিশ্রণ-ও ঘটানো হয়েছে। আবার পশুপাখীর চরিত্রের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের কন্ঠস্বর প্রদান করেছেন। ইদানীং এই ধারা আরো বেশি করে দেখা যাচ্ছে। একইসাথে নামী সংগীত শিল্পী, বা অন্যান্য দেশে-বিদেশের ভালো আর্টিস্টরাও কাজ করছেন। ফলে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশের বাজার ধরার তাগিদে ভারতীয় অ্যানিমেশন সিনেমাগুলি কিন্তু নিছক-ই পশুপাখী সম্বন্বিত শৈশব প্রজন্মের জন্য-ই নয়, এখন তা সারা পৃথিবীর কাছেই আমাদের বলিউডের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংস্কৃতি। যদিও ভারতের ক্ষেত্রে অন্ততঃ এই ধরণের প্রযোজনাকারীর সংস্হার বিষয়বস্তুর মূল ভিত্তি সংখ্যাগরিষ্ঠভাবেই এখনো পর্যন্ত আমাদের পুরোনো নীতিকথার গল্প বা বিষয় নির্ভর। ফলে তাতে পরিশেষে কিছু সামাজিক তাৎপর্য্যপূর্ণ বার্তাই থাকছে। কিন্তু যে সমস্ত অ্যানিমেশন সিনেমাগুলি পুরোপুরিভাবেই বিদেশের মাটিতে তৈরী হয়ে এদেশে আসছে (সেক্ষেত্রে হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু ভাষার পরিবর্তন হচ্ছে বা সাব-টাইটেল দেওয়া হচ্ছে) সেক্ষেত্রে কিন্তু বিনোদনের আঙ্গিকের সাথে-সাথে নীতির প্রসঙ্গ-ও এদেশে অনেক সময় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। ভারতীয় সিনেমায় অ্যানিমেশন-এর ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে পশুপাখীর মূল চরিত্রগুলির ওপর বলিউড বা অন্যান্য বিখ্যাত তারকাদের মুখের আদল বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বা তাদের পর্দার আদব-কায়দাগুলি পশুপাখীর আদব-কায়দা হয়ে যাচ্ছে অ্যানিমেশনে। বিখ্যাত সংগীতের সুর বা কথোপকথন-ও দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্যের কথা ভেবেই। ফলে পশুপাখী তখন আর ছোটোদের কাছে পৃথক একটি জগৎ নয়, তা বিনোদনের বিষয়বস্তু। সর্বোপরি আমরা যেটা দেখতে চাই, মাধ্যম যেটা দেখাতে চাইছে কাল্পনিক উপস্হাপনায় পশুপাখীর তাই পর্দায় করে বেড়াচ্ছে।

দুরদর্শন বা টেলিভিশন: চলচ্চিত্রের মতোই দুরদর্শনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো বেশি, কারণ তা গ্রহণের সুযোগ-ও অনেক বেশি। তবে তার আগে একবার দেখে নেব এর উদাহরণের প্রসঙ্গটি।

সংখ্যায় আবার অল্প হলেও ছোটোদের জন্য স্কুলে, বা বড়দের জন্য কলেজ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যানিমেশন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে মূলত অ্যানিমেশনের অনুষ্ঠান তৈরী হয়,যার গুণগত মান খুবই ভালো হয়।। গণমাধ্যমে তা বহুলভাবে সম্প্রচারিত না হলেও অনেক সময়েই তা আমরা নানান জায়গা থেকে দেখতে পারি, যেমন ইউ টিউব বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে। এগুলি অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে তত বহুল প্রচারিত নয়।

ভারতের টেলিভিশন সম্প্রচার ব্যবস্হার ক্ষেত্রে যে যে চ্যানেলগুলি অ্যানিমেশনের জন্য জনপ্রিয় যেমন – NICK, DISNEY CHANNEL, HUNGAMA TV, POGO, CARTOON NETWORK, JETIX প্রভৃতি প্রায় সবই মূলত বিদেশী সংস্হার প্রযোজনায় পরিচালনাধীন। অবশ্য কম খরচে ভালো মানের জন্য এরা ভারত থেকে অনুষ্ঠান তৈরী করে সব জায়গায় সম্প্রচার-ও করছে। কিন্তু তাতে ভারতের সংস্কৃতিবোধের প্রভাব কম। অবশ্য ‘ছোটা ভীম’ এই সিরিয়ালটি সাম্প্রতিককালে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা পুরোপুরি ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষিতে তৈরী অ্যানিমেশন। তা সত্ত্বেও বলতে হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের মতোই অ্যানিমেশন সিনেমা তৈরীর ইতিহাস পুরোনো এবং বিস্তৃত। কিন্তু অদ্ভূত লাগলে-ও এটা সত্যি যে টিভির সাথে এবং সমান্তরালভাবে-ই টিভির মধ্য দিয়েই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এদেশে অন্তত বিশাল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর মূল কারণ অব্শ্যই মাধ্যম হিসেবে টিভির জনপ্রিয় । টিভির ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটবাহিত অনুষ্ঠান দেখার দরজা যখন বিংশ শতকের শেষ দিকে খুলতে শুরু করল তখন অ্যানিমেশনের উপস্হাপনা ছিল মূলত ‘অ্যাকশনধর্মী’ আমেরিকাকেন্দ্রিক। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার পশুপাখীর কাল্পনিক চরিত্র নির্ভর কিছু কার্টুন-কমিকসের বই এবং অনুষ্ঠান দেখা গেছিল। কিন্তু তা একেবারেই কম। ফলে আমেরিকাকেন্দ্রিক অ্যানিমেশন যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং সেই জনপ্রিয়তার খুব একটা ভাটা পড়েনি (উদাহরণ – হিম্যান এ্যান্ড দ্য মাস্টার্স অফ ইউনিভার্স, ডোনাল্ড ডাক, টম এ্যান্ড জেরি)। অ্যাকশন আর হাস্যরসের সংমিশ্রণে পরবর্তীকালে এর অনেকটাই পরিবর্তনের দিক দেখা গেছে। লক্ষ্যণীয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতে গণমাধ্যমের চরিত্রের-ও বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। সোপ-অপেরা, মেগা-সিরিয়াল, রিয়্যালিটি শো, সিনেমা-বিনোদন, ২৪*৭ সংবাদের চ্যানেল, খেলাধূলো -ভারতীয় ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছে। এই প্রভাব শিশুদের ওপরে-ও পড়েছে। একইসাথে বিনোদনভিত্তিক অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে চাহিদাও বেড়েছে  প্রচুর। শিশুরা নিজেদের মতো করে যখন অ্যানিমেশন দেখতে চেয়েছে তখন যে বিনোদন মাধ্যমের বহুল প্রচারিত উপস্হাপনার সাথে তাদের যে চাহিদার মানসিক ফাঁক ছিল, তা ধীরে-ধীরে পূরণ করেছে নতুন বহুজাতিক কার্টুন চ্যানেলগুলি। আজকের দিনে অ্যানিমেশন প্রোগ্রামের বা উপস্হাপনার ক্ষেত্রে তাই এশীয় দেশের সংস্কৃতির প্রভাব (যেমন-জাপান) অত্যন্ত বেশি। কারণ এদের তৈরী অনুষ্ঠান-ই শহর বা মফঃস্বলের শৈশব প্রজন্ম এখন ভীষনভাবে উপভোগ করছে। অ্যাকশনের বিষয় আজও রয়েছে, খালি পশুপাখীর চরিত্র, তার উপস্হাপনার আঙ্গিক অনেকটাই স্মার্ট, ঝাঁ-চকচকে বা ‘ফিনিশ প্রোডাক্ট’ হয়ে গেছে। ভারতে জনপ্রিয় দশটি অ্যানিমেশন প্রোগ্রাম টিভিতে –

  1. NINJA HATTORI (JAPAN),
  2. OGGY AND THE COCHROACHES
  3. TOM AND JERRY
  4. BEN. 10
  5. DORAEMON (JAPAN)
  6. PARMAN (JAPAN)
  7. CHHOTA BHEEM (INDIA)
  8. KUREYON SINCHAN (JAPAN)
  9. MR. BEAN ANIMATION SERIES
  10. POWER LENJER S.P.D.

[তথ্যসূত্র: TAM Media in India, 2010 research.]

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে এই ধরণের অনুষ্ঠান দেখে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ বিশেষ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ বিষয়বস্তুর গভীরতার থেকে কম সময়ে কত বেশী পরিমাণে জনপ্রিয়-বিনোদন দিতে পারে তার দিকে-ই জোর দেওয়া হচ্ছে। সংলাপ-কার্যকলাপ-চরিত্র হয়ে গেছে খামখেয়ালীভরা । মানুষের সাথে পশুপাখী জগতের যোগসূত্রের মধ্যে কল্পনার সীমারেখার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিশা নেই। অস্বাভাবিক এক জগতে বেশীরভাগ সময় শিশুরা থাকতে চাইছে বাড়িতে। ফলে বাস্তবে পশুপাখীর চারিত্রিক জগত এবং বিনোদন মাধ্যমের কাল্পনিক উপস্হাপনায় পশুপাখীর জগৎ আজ একই বিশ্বের দুটি মেরু। এই ধরণের অনুষ্ঠানের উর্ধ্বমুখী চাহিদার জন্য আবার ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় মূল অনুষ্ঠানকে ঠিক রেখে তা সম্প্রচারের মাধ্যমে ভৌগোলিকভাবে সংস্কৃতির বন্ধনকেও মুছে দেওয়া হচ্ছে।

কার্টুন-কমিকসের বই: ভারতের প্রেক্ষিতে কার্টুন এবং কমিকসের বইয়ের ইতিহাস এবং তার বর্তমান চরিত্র সম্বন্ধে আলোচনা নিঃসন্দিহানভাবেই অত্যন্ত বিশাল তথ্যসমৃদ্ধ এবং বিস্তৃত আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। বিশেষ করে এক্ষেত্রে শুধু পশুপাখীর চরিত্রের উপস্হাপনার দিকগুলি সম্বন্ধেও যদি ধারণালাভ করতে চাওয়া হয় তবে যথেষ্ট ধৈর্য্য, সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তাইজন্য এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে এবং বর্তমান অবস্হার প্রেক্ষিতকেই এখানে সাধারণভাবে জোর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে যতটা সম্ভব মূল আলোচনাতেই পুরো গুরুত্ব থাকে। ভারতে মূলত হিন্দি, ইংরেজী বা বাংলা ছাড়াও আরো বহু ভাষাতে কমিকসের বই প্রকাশিত হচ্ছে (যেমন – মালায়ালাম কিংবা কেরল ভাষা)। বাংলা ভাষায় কমিকসের বা কার্টুনের প্রকাশনার ইতিহাস-ও অনেক প্রাচীন। সুকুমার রায়ের সৃষ্টি থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত ধরলে এ তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যাবে। তবে মূলত যা একসময় পৌরাণিক গল্প বা উপন্যাস বা চরিত্র নির্ভর ছিল তা এখন দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তার অনেকটাই পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন – ছবির গুণগত মান, বিষয়-উপস্হাপনা, চিত্র এবং গল্পবিন্যাস, ভাষা, ডিটেলিং, মার্কেটিং প্রভৃতি সবদিক থেকেই মুদ্রিত কার্টুন-কমিকস সমান তালে পাল্লা দিচ্ছে অন্যান্য গণমাধ্যমের সাথে (কোথাও বা পরিপূরকভাবে গাঁটছাড়া বাধছে)। এই সমস্ত সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে আবার চলচ্চিত্র কিংবা টিভির জন্য অনুষ্ঠানও তৈরী হচ্ছে। ইন্টারনেট, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে, ব্লগ বা কমিউনিটির মাধ্যমে, জামায়-কফি মাগে সর্বত্র-ই কার্টুনের পশুপাখী চরিত্রগুলির অবাধ বিচরণ। ভারতের ক্ষেত্রে কার্টুন সিনেমা বা টিভির অনুষ্ঠান যা মূলত নীতিকথার গল্প-নির্ভর উপস্হাপনা, বহুল প্রচারিত মুদ্রণ মাধ্যমের উদাহরণের ক্ষেত্রে ভারতের কমিকসের প্রসঙ্গে-ও এর খুব একটা ব্যতিক্রম দেখতে পাওয়া যায় না। তবে সমসাময়িক অবস্হার প্রেক্ষিতে তাকে করে তোলা হচ্ছে আরো বিজ্ঞান-নির্ভর, প্রযুক্তি সর্বস্ব। এর পাশাপাশি রয়েছে বাস্তবের সাথে কল্পনার মিশেলের প্রচেষ্টা। ফলে পশু বা পাখী এবং অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও টিভির মতো কমিকসগুলির চরিত্রায়ণে খুব একটা চোখে পড়ার মতো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। বরং বলা যায় যেহেতু মুদ্রণ মাধ্যমে সময় নিয়ে পড়বার এবং তার স্হায়িত্ব অনেক বেশী তাই কাল্পনিক চরিত্রাঙ্কণে দেহাবয়ব-রঙের ব্যবহার চরিত্রের ভালো বা খারাপের দিকগুলি যাতে আমাদের মনে অনেক বেশী করে প্রভাব বিস্তার করে তাই যতটা সম্ভব তা ভালো করেই করা হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রে এর বাজার-ও অন্যান্য মাধ্যমের মতোই স্ফীত হচ্ছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু ভালো নয়, ব্যতিক্রমী-ও হতে হবে। সেক্ষেত্রে সীমাসংক্রান্ত কোনো আইন, মাধ্যমের এইক্ষেত্রে অন্তত এখনো ভারতে নেই। নীতির প্রসঙ্গে বাধ্যবাধকতা প্রত্যেকটা সংস্হার ক্ষেত্রেই অবশ্য আলাদা।

কার্টুন নিঃসন্দেহে খুব চড়াভাবেই কোনো কিছুর অচলায়তন বা কোনো কিছুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য ব্যবহার্য্য সুদূর অতীত থেকেই একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমরুপী অস্ত্রবিশেষ। মুদ্রণ মাধ্যমের ক্ষেত্রে ‘স্যাটায়ার’-ধর্মী উপস্হাপনায় একে ব্যবহারের কৌশল শিল্পসমৃদ্ধভাবেই স্বাধীনচেতা শিল্পীর বিশেষ পছন্দের। কিন্তু কার্টুনে পশুপাখীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে কোনো বক্তব্য পেশের সময় স্হান-কাল-ভেদে বিতর্ক-ও দানা বেঁধেছে অনেক সময়-ই। আজকের দিনের ক্ষেত্রেও এই বিতর্ককে যতটা সম্ভব দুরে সরিয়ে রেখেই উন্মুক্ত গণমাধ্যম ব্যবস্হার মনের মধ্যে অবাধ গতিবিধির এবং ভারতের সাংস্কৃতিক চর্চার বিষয়-এর মধ্যে খানিকটা ভারসাম্য বজায় রেখেই এখনকার ভারতীয় কমিকসের বইয়ের পাবলিশার্স বা প্রকাশক এবং শিল্পীরা তাদের বিনোদনের মধ্যে শিল্প এবং ব্যবসাকে ধরে রেখে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। যেহেতু কার্টুন-কমিকসের দেশের এবং বিদেশের সম্বন্বয়ে এই ধরণের ধারাটি মূলত নতুন এবং ভীষণভাবেই বিনোদনকেন্দ্রিক, একে পড়ার নুন্যতম অক্ষরজ্ঞানের প্রয়োজন তাই তার টার্গেট অডিয়েন্স-ও একটু বেশী বয়সের হয় (টিভির তুলনায়) এবং সর্বোপরি এগুলি কেনার জন্য যে অর্থ লাগে তা সহজে আমাদের দেশের সর্বাধিক সংখ্যক শৈশব প্রজন্মের কাছে কম-বেশী নির্দিষ্ট সময়ের আগে হাতে আসে না এখনো (তুলনামূলকভাবে টিভির রিমোটের স্বাধীনতা অনেক বেশি)। তাই এর প্রভাব হয় অন্তত ধীরগতির, কিন্তু গভীরতর। ফলে এই মুহূর্তে সুনিশ্চিতভাবেই এর ভালো বা খারাপের সম্পর্কে কিছু বলা সমীচীন নয়। পশুপাখী জগতের কাল্পনিক উপস্হাপনা – সাধারণ মানুষ এবং বাস্তবিক পশুপাখীর জগৎ এগুলির মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কার্টুন-কমিকসের নতুন এই ধারাটির ভূমিকা অনেকটা সংস্কৃতিকরণের বিমিশ্র পর্যায়ে রয়েছে, অন্তত ভারতে।

কিছু উদাহরণ দিয়ে আলোচনা শেষ করা যেতে পারে। কার্টুন-কমিকসের ক্ষেত্রে ভারতের কিছু পাবলিশার্স এবং বেশ কিছু চরিত্র ইতিমধ্যে-ই প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অবশ্য সেক্ষেত্রে পশুপাখীর তুলনায় মানুষের চরিত্রের উদাহরণ বেশি। পশুপাখীর চরিত্র কম বা বেশী, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপস্হিত এই ধরণের কিছু কমিকস, পাবলিশার্স এবং চরিত্রের নাম হলো – চাঁদমামা, চাঁচা চৌধুরী, বিক্রম-বেতাল, বেতাল পঞ্চবিংশতি, রামায়ণ, মহাভারত, এবং এ ধরণের আরো পৌরাণিক গল্পের বা চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত কার্টুন প্রভৃতি। কিছু পাবলিশার্স – Vimanika Comics Publishers, Kriyetic Comics, Arkin Comics, Comix India, Level 10 Comics প্রভৃতির কথাও বলা যায়।

চলচ্চিত্র তথা টিভির ক্ষেত্রে যেহেতু প্রামাণ্য তথ্য তথা উদাহরণ এবং সমীক্ষার সংখ্যা অনেক বেশী করে ও অনেক নির্ভরযোগ্যভাবে বর্তমান সময়েই পাওয়া সম্ভব তাই তার ওপর ভিত্তি করে এই বিষয়ের মূল চিত্র সম্পর্কে একটা রুপরেখা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। কার্টুন-কমিকসের ক্ষেত্রে, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল ব্লগের ক্ষেত্রে এখনো এ বিষয়ে আরো পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একইসাথে একথাও মনে রাখতে হবে যে অন্যান্য মাধ্যমের মধ্য দিয়েও পশুপাখী জগতের কাল্পনিক উপস্হাপনার অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। যদিও তা সংখ্যায় কম। এতে মাধ্যমগুলির সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায় – নাটক, রেডিও, সংবাদপত্রের কার্টুন প্রভৃতি। আবার কিছু মাধ্যম বয়সে আমাদের দেশে নবীন, যেমন – ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ব্লগ – কমিউনিটি – ফোরাম প্রভৃতি কিংবা ভিডিও গেমস। দেশের সবধরণের মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ধীরে-ধীরে বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ মাধ্যমগুলির, এক্ষেত্রে ভূমিকা সম্বন্ধে আলোচনার অবকাশ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

পশু-পাখীর নিজস্ব শারীরিক এবং মানসিক জগৎ:

পশুপাখী তথা বিভিন্ন প্রাণী প্রজাতির মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরিক জগৎ একটি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং জটিল বিষয়। এক্ষেত্রে তার সংক্ষিপ্ত একটি সার্বিক রুপ সম্বন্ধে-ই এখানে আলোচনা করাটা শ্রেয়। বিশেষ করে মাধ্যমে যা-যা দেখানো হয় তার প্রেক্ষিতে-ই।

সাধারণভাবে হাতি, ঘোড়া, বিড়াল, কুকুর কখনো কখনো বন্যপ্রাণী হিসেবে বাঘ, সিংহ, শেয়াল, বাঁদর, হনুমান, খরগোশ, হরিণ প্রভৃতিকেই মাধ্যম বেশি করে চরিত্রের মধ্য দিয়ে উপস্হাপিত হয়। এছাড়াও, পিঁপড়ে, ইঁদুর, পাখী, বোলতা, কচ্ছপ, সাপ বিশেষ বিশেষ কাল্পনিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে আমরা অনুষ্ঠান বা সিনেমার ক্ষেত্রে উপস্হাপিত হতে দেখতে পাই। বন্যপ্রাণীদের থেকে গৃহপালিত এবং গবেষণালব্দ্ধ প্রজাতির মধ্যে তাদের আচার-আচরণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আত্মপ্রকাশের ভঙ্গী সাধারণভাবেই অনেকটা সুস্পষ্টভাবে উন্নত হয়। আবার দেশ-স্হান-কালভেদে এর ভিন্নতাও ঘটে। তবে সাধারণভাবে প্রাণী হিসেবে বিভিন্ন আওয়াজ করে ভাবপ্রকাশ, ভয়, রাগ, দুঃখ, ভালোবাসা, একাত্মবোধ, কিছু তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারীভাবে মনে রাখার ক্ষমতা এবং কিছু শেখার প্রবণতা (অপেক্ষাকৃত উন্নত পশুপাখীর ক্ষেত্রে), উৎফুল্লতা, খেলা করার ইচ্ছে, অধৈর্য্যতা, একগুয়েমি, জেদ, দৃড়ভাবে কিছু করার ইচ্ছে, লজ্জা ও সততা, অপরাধবোধ (গৃহপালিত পশুর ক্ষেত্রে) প্রভৃতি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি কম বা বেশি চোখে পড়ে। এর সাথে যুক্ত হয় শারীরবৃত্তিক ক্রিয়াকলাপের বিভিন্নতা। কুকুর, বাঁদর, ঘোড়া, বিড়াল, ডলফিন প্রভৃতি প্রাণীর ক্ষেত্রে এগুলির উন্নততর পর্যায় চোখে পড়ে। আবার কোনো-কোনো সময় এদের আচার-আচরণ ব্যতিক্রমীভাবেই খুব উন্নত হয়। জটিল কিছু-কিছু বিষয়ও এরা সহজে রপ্ত করে বা সময় নিয়ে আয়ত্ত করে। দেহের গঠনগত এবং সার্বিক বৈশিষ্ট্য (মস্তিষ্কের গঠন-ও অন্তর্ভূক্ত) অনুযায়ী প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ঘ্রাণশক্তি, রাতে দেখার ক্ষমতা, জোরে দৌঁড়োনো বা উঁচুতে উড়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয় তথা পারিপার্শ্বিক প্রতিকূল পরিস্হিতিকে আগাম আঁচ করার ক্ষমতা প্রভৃতি জিনিসগুলি আমরা দেখতে পাই। এক্ষেত্রে অব্যশই তারা মানুষের থেকে উন্নততর পর্যায়ে রয়েছে। এবং এই সমস্ত বিষয়গুলির মধ্যে অনেক নতুনত্বের দিক সম্বন্ধে এখনো গবেষণা চলছে। একইসাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে ভৌগোলিকভাবে স্হান পরিবর্তনের জন্য ও পৃথিবীর আবহাওয়া পরিবর্তনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এদের শারীরিক তথা মানসিক বিষয়গুলির পরিবর্তন সদা পরিবর্তনশীল। তাই অনেক প্রজাতির অবলুপ্তি ঘটে স্হান হয়েছে সিনেমা বা টিভির পর্দায়। এই অবলুপ্তির বিষয়েও কিন্তু গবেষণা চলছে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় (যেহেতু মাধ্যমব্যবস্হায় উপস্হাপনা কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়) গৃহপালিত এবং বণ্যপ্রাণী-পশুপাখী (বিশেষত যারা উগ্র স্বভাবের) এদের মধ্যে কিন্তু সাময়িক সহাবস্হান খুব সহজে সম্ভবপর নয় কখনোই, সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। ব্যতিক্রমী ঘটনার উদাহরণ-ও খুবই কম।

মাধ্যম এবং মানুষের চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে ফারাক:

নাটক, সংবাদপত্র, কার্টুন-কমিকসের বই ও ম্যাগাজিন, রেডিও – এ সমস্ত ধরণের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে মূলত ভৌগোলিক গণ্ডীর মধ্যে নির্দিষ্ট জনসংখ্যার মধ্যে প্রচারের সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে সেক্ষেত্রে সস্তা বিনোদন বা জনপ্রিয়তা অর্জনের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায় কিছু বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের সুনাম অর্জন, যাতে দীর্ঘস্হায়ীভাবে ইতিবাচক ‘ইমেজ’ ধরে রেখে বাজারে টিকে থাকা যায়। যখন ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর প্রসঙ্গ আসে তখন কিন্তু চিত্রটা অনেকটা-ই পাল্টে যায়। কারণ অধিকাংশ অনুষ্ঠান যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয় বা চলচ্চিত্রে পশুপক্ষীকে যেভাবে উপস্হাপিত করা হয় তা এই মুক্ত তথ্যপ্রবাহের যুগে সব জায়গায় প্রায় সমানভাবেই পৌঁছে যাচ্ছে। বহুজাতিক, বেসরকারী-দেশী বা বিদেশী, স্যাটেলাইট বাহিত সবধরণের মাধ্যমের মূল লক্ষ্য একটাই যত বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। ফলে সরকারী নিয়ন্ত্রণ, আইন-কানুন দিয়ে নৈতিকতার বেড়াজালে মাধ্যমকে বাধা বা তার ওপর নজরদারি আজকের যুগে কার্যত অসম্ভব। মিডিয়া-সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকটা সেখানেই জোরালো ভিত পায় যেখানে সমাজে তুলনামূলকভাবে বৈষম্য এবং বঞ্চনা বেশি, শিক্ষার হার কম, সার্বিক অস্হিরতা সমাজে বেশি। ফলে বিনোদনের মধ্য দিয়ে মাধ্যমগুলি কিছু ভেদাভেদ-বৈষম্য, অলীক কল্পনার বিষয় আমাদের শৈশব প্রজন্মের মনের মধ্যে যখন ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তখন উপস্হাপনার মধ্য দিয়ে কোনো অর্থের সৃষ্টি এবং তার কি পরিবর্তন ঘটছে তার প্রতি গবেষণামূলক দৃষ্টি নিয়ে আমাদের পক্ষে সর্বক্ষণ নজরদারি সম্ভবপর হয় না। ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের বিষয়ের গুরুত্ব কিন্তু আরো বেশি। একইসাথে কাল্পনিক উপস্হাপনায় যে ধরণের বিষয় বেশি গুরুত্ব পায় তার টার্গেট অডিয়েন্স মূলত শৈশব প্রজন্ম, যারা আমাদের ভবিষ্যতের ভিত-ও। এক জায়গায় প্রেক্ষিতে তৈরী অনুষ্ঠান যখন সুদূর অন্য কোনো দেশের মফঃস্বল বা শহরে তাদের ভাষায় দেখানো হচ্ছে, তার মূল বিষয়বস্তর কিন্তু কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সেই দেশে কোনো মাধ্যম পশুপাখীকে যতটা উন্নততর জীব হিসেবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে কাল্পনিকভাবে অন্তর্ভূক্ত ভারতের দেশে তার কোনো যথার্থ্যতার জায়গা নেই।

 মাধ্যমব্যবস্হার ভূমিকা এবং সমাজ :-

জীবনযাপনে অভিজ্ঞতালব্দ্ধবোধ বা সংস্কৃতি

মধ্যস্হতা                                        মধ্যস্হতা

প্রতিনিধিত্বকরণে সৃষ্টিবোধ বা সংস্কৃতি (মাধ্যম)

(সূত্র: টমলিনসন,জন। “কালচ্যারালইম্পিরিয়ালিজম্: এক্রিটিক্যালইনট্রোডাকশন”। পিন্টার পাবলিশার্স।  লন্ডন।পৃষ্ঠা ৬১।১৯৯১।)

এখানে মধ্যস্হতা হলো যোগাযোগ প্রক্রিয়া এবং অর্থ সঞ্চালন করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নানা ঘটনার অর্থ তৈরি, পরিবর্তন, তার ব্যাপ্তি ঘটে। ফলে মুনাফা লাভের তাগিদে অনেক সময় দেখা যায় মাধ্যম নিজের মতো করে বাস্তব-এর সংজ্ঞা তৈরি করছে। চলচ্চিত্রের মতো শিল্প সম্বন্বিত ক্ষেত্রে এর প্রভাব যে ভয়ানক তা নিয়ে আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ইউরোপ কিংবা অন্যান্য দেশে ইতিমধ্যেই প্রচুর গবেষণা হয়েছে। টম-জেরির কার্টুনে বর্ণ বৈষম্য নিয়ে বিতর্ক সাম্প্রতিককালেই দেখা গেছে (প্রসঙ্গ-সূত্র: প্রতিবেদন, “Not in toon with times; Tom & Jerry in race row”. Times of India, Kolkata ed., 12th August, 2013). বন্যপ্রাণী আর তাই শুধু নিজেদের জগতে বা বনে সুরক্ষিত নয়, মানুষের মনের ভেদাভেদের জগতেও ঢুকে পড়েছে। কারণ প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র মাধ্যম ব্যবস্হাই চাইছে ‘স্যাটায়ার’-এর মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তার সাথে মানুষ নিজের মতো করে পশুপাখী সম্বন্ধে ভাবুক। মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং পৃথিবীর নানা ঘটনার আঁচ তাই গিয়ে পড়ছে পশুপাখী জগতের কাল্পনিক উপস্হাপনাতেও। এই ধারা অনেক সময় ধরেই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলে আসছে। প্রযুক্তির স্বাধীনতা এবং কাল্পনিক উপস্হাপনার এই স্বাধীনতার ধারার ধারণার সাথে আমরাও সয়ে গেছি। ফলে পশুপাখীর বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে সঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা তো দুরে থাক, সাধারণ ধারণাগুলি-ও অনেকটা আবছা হয়ে গেছে।

পশ্চিমী গণমাধ্যম-বিশেষজ্ঞদের মতে, এক বা একাধিক পশ্চিমী দুনিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাদের মালিকানাভুক্ত মাধ্যমসংগঠনগুলি মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্হাকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশের মাধ্যমব্যবস্হার বন্টনব্যবস্হা এবং বিষয়বস্তুর নির্বাচনে প্রবল প্রভাব খাটাচ্ছে। এক্ষেত্রে পাল্টা চাপ দিতে পারছে না এই অসমর্থ দেশগুলির মাধ্যমব্যবস্হা। ফলে পশ্চিমী দুনিয়ার আরোপিত সংস্কৃতির ধাঁচের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সহায়কের ভূমিকা নিয়ে মাধ্যম জন্ম দিচ্ছে এমন এক সাম্রাজ্যবাদের যা পরিচিত সাম্রাজ্যবাদের ধরণ থেকে অনেক কম দৃশ্যমান এবং সুক্ষ্মতর। এ্যারিয়েল ডর্ফম্যান এবং আরুমঁ মাতেলার তাদের, “হাউ টু রীড ডোনাল্ড ডাক” (৩) বইতে বিশ্লেষণ করে দেখান যে, জনপ্রিয় এই কমিকস কিভাবে পুঁজিবাদের প্রবণতা-কে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার একইসাথে তৃতীয় বিশ্বের প্রসঙ্গে এখানে ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে অপরিণত বা শিশুমনস্ক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এছাড়াও নারীসমাজের পরনির্ভরশীলতা, পুঁজিবাদী সমাজের প্রচলিত শ্রেণী সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে দেখানো, এই নিরীহ পশুপাখীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। মাধ্যম-সংস্কৃতির বিষয়ে আরো গবেষণা করেছেন যারা গভীরভাবে তাঁদের মতে-নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের প্রতি মানুষকে আবদ্ধ করে রাখাটাই মাধ্যমব্যবস্হার উদ্দেশ্য। বাইরের জগৎ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তোলার জন্য মাধ্যমে এমন কিছু কাল্পনিক চরিত্রের কার্যকলাপ দেখানো হয়, যার সাথে বাস্তবের কোনো যোগ নেই। পশুপক্ষীকে এইভাবে ভোগবাদের শিকার করে তোলাটা অনেকের মতেই সমাজে নারীকেন্দ্রিক বিষয়ের প্রতি মাধ্যমের সমান্তরাল ভোগবাদী মনোভাবেরই পরিচয়। এই প্রবণতা আমাদের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের পক্ষেও পরোক্ষে ক্ষতিকারক। কারণ আমরা শুধু প্রাণীজগৎ থেকে নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক প্রয়োজনীয়তা মেটাবো কিভাবে এবং তার থেকে শুধুমাত্র ক্ষতিকারক দিক আমাদের ক্ষেত্রে কি আছে মাধ্যম তার ওপরেই বেশি করে জোর দিচ্ছে। ফলে যখন বাড়িতে পশুপাখী পোষা শখের থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে অর্থের দাপট, নিজস্ব মানসিক চাহিদা মেটানো কিংবা নিতান্তই অর্থনৈতিক বা জৈবিক চাহিদাপূরণ তখন বাইরের বিস্তৃত পশুপাখীর নিজস্ব জগৎ হয়ে যাচ্ছে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন।

মাধ্যমব্যবস্হার প্রভাব তথা প্রসারের ক্ষেত্রে ভারতের প্রেক্ষিতে আরেকটি বিষয়-ও উল্লেখ্য যে চলচ্চিত্র এবং দুরদর্শনের পাশাপাশি কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, কম্পিউটার এবং মোবাইলে ভিডিও গেমস খেলার মানুষের সংখ্যা ক্রমশ-ই উর্ধ্বমুখী। শহর-মফঃস্বল ছাড়িয়ে আস্তে-আস্তে তা গ্রামাঞ্চলেও ঢুকে পড়েছে। ফলে এক্ষেত্রে বিস্তৃতভাবে এই মুহূর্তে অন্তত সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যাখা করা সম্ভব নয় যে পশুপাখী জগতের এই সর্বব্যাপী কাল্পনিক উপস্হাপনা কি প্রভাব বিস্তার করছে, এর তাৎক্ষণিক তথা সুদূরপ্রসারী প্রভাব কি হচ্ছে। সাধারণভাবেই সমাজবিজ্ঞানী এবং গণমাধ্যম-গবেষকদের মতে অতিরিক্ত গণমাধ্যম নির্ভরতা আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বাধাদান করে, বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, এবং আমাদেরকে করে তোলে আত্মকেন্দ্রিক। ভিডিও গেমসের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাবের সম্ভাবনা জন্মানো নিয়ে জোরালো বিতর্ক সর্বত্র-ই বরাবরই বিদ্যমান। এসবকে মাথায় রেখেই বলতে হয় পশুপাখীদের এই ধরণের কাল্পনিক উপস্হাপনা নানান বিনোদনের জগৎ থেকে দেখে বড় হতে অভ্যস্ত এই সময়ের শৈশব প্রজন্ম পশুপাখীদের বাস্তবিক জগৎ থেকে বোধহয় অনেকটাই দুরে সরে গেছে। কারণ সঠিক তথ্য এইধরণের মাধ্যমগুলি থেকেই আবার পাওয়া গেলে তা তুলনামূলকভাবে কম, অনেক সময় তা ততটা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্হাপিত হয় না। সর্বোপরি বিদ্যালয় বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ছাড়া তা নিয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করার অবকাশ-ও কম। শৈশব প্রজন্মকে সঠিক ধারণা দেওয়ার মানুষ এই ব্যস্ততাসর্বস্ব ‘নিউক্লিয়ার’ পরিবারের সময়ে ক্রমশ কমে যাচ্ছে। দৈনন্দিন পার্থিব জীবনের লক্ষ্যপূরণের বাইরে চারপাশের জগতের জন্য কিছু করার তাগিদের অভাবের সূত্রপাত পরোক্ষে হলেও কিছুটা বোধহয় জীবনের প্রাথমিক পর্বেই ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। প্রসঙ্গ ধরেই বলা যায় পৃথিবীর আবাসযোগ্য জায়গার চাহিদার জন্য, শিল্পস্হাপনের জন্য ঘন বনাঞ্চল ক্রমশ আমাদের দেশে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে খিদের তাগিদে প্রাণীদের লোকালয়ে চলে আসার ঘটনাও বাড়ছে (পাখীর ক্ষেত্রে মোবাইল টাওয়ার যথেচ্ছ স্হাপনের বিষয়টিও রয়েছে)। মাধ্যমের সাহায্যে রিমোটের স্বাধীনতায় ড্রয়িংরুমে পশুপাখী যতটা সহজে জায়গা করে নিচ্ছে বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমরা হয়তো ততটা এদেরকে বনে সুস্হভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত দিচ্ছি না। আবার প্রাণীজগৎ সম্বন্ধে যতটা ভালো গবেষণার কাজ হচ্ছে এবং তার থেকে এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে ভালো দিকগুলি সম্বন্ধে তথ্য জানা যচ্ছে তাও কিন্তু মাধ্যমের বিনোদনমূলক চিন্তাভাবনায় খুব বেশী প্রকাশ পাচ্ছে না। অবশ্য বর্তমানে ধীরে হলেও কিছু ভালো কাজের উদাহরণ সামনে আসছে, বাণিজ্যিক সফলতার সাথেই। এক্ষেত্রে বিশ্বের এবং ভারতের সব মাধ্যমব্যবস্হার ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য যে, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে কিছু-কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সাবধানতামূলক সচেতন দৃষ্টিভঙ্গী দেওয়া উচিত। যেমন- যে সমস্ত পশুপাখীর উদাহরণ আমরা দৈনন্দিন জীবনে বেশি করে দেখি তার বাইরেও প্রচুর প্রজাতি রয়েছে। শুধুমাত্র কিছু চরিত্র বেশী করে না তুলে ধরে তাকে আরো বিস্তৃত করা উচিত। একইসাথে মাধ্যম-সংস্কৃতির প্রতীকী অর্থে কোনো কিছুর সরলীকরণ করে বারবার দেখানোর বিপজ্জনক প্রবণতা অনুষ্ঠানের আঙ্গিকে কমাতে হবে। যেকোনো ধরণের সংস্হাও যাতে তাদের ব্যবসা বা বিপনণের তাগিদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পশুপাখীর মাধ্যমব্যবস্হায় উপস্হাপনাকে বাজার ধরার অর্থে কোনোর কম নেতিবাচকভাবে যাতে ব্যবহারের জন্য যোগসূত্র স্হাপন না করে সেটাও সবাইকে-ই খেয়াল রাখতে হবে। যেমন- মুরগী, হাঁস, ছাগল এদেরকে যতটা দৃড়ভাবে তাদের নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মাধ্যমব্যবস্হা তাদের বিনোদনমূলক উপস্হাপনায় তুলনায় তুলে ধরে, তার থেকে অনেক বেশি বোধহয় তাদেরকে নিয়ে বাজার ধরার কৌশলটাই রপ্ত করে। আবার বাঘ-সিংহ-সাপ মানেই হিংস্রতা-উগ্রতা-বন্য-বিষাক্ত এইধরণের চিন্তাভাবনাকে দুরে সরিয়ে রেখে পশুপক্ষীর নিজস্ব জগতের সাথে মানুষের চিন্তাভাবনার জগতের ফারাক মাধ্যমগুলিকেই কমানোর চেষ্টা করে যেতে হবে। দৃশ্য-শ্রাব্য এবং মুদ্রণমাধ্যমে সংস্কৃতির এই ‘এফেক্ট’গুলিকে সরিয়ে স্বাভাবিক ‘এফেক্ট’-কে ধরে রাখার কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন। স্বভাবত-ই আমাদের নিজস্ব নৈতিকতা এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলভিত্তিক চিন্তাভাবনাকে সর্বাগ্রে সবলভাবে গড়ে তোলাটা তাই এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবেই নিঃসন্দেহে অন্ততঃ তাৎপর্য্যপূর্ণ।

নতুন চিন্তাভাবনার অবকাশ – প্রয়োজনীয়তা এবং পরবর্তী গবেষণার সম্ভাব্যতা:

মূল আলোচনার বেশ কতগুলি প্রেক্ষিত সম্বন্ধে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবেই অনেক প্রামাণ্য তথ্য আছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো পাওয়াও সম্ভব। যেমন- এই আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি পশুপাখী সম্পর্কিত ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন বা নীতির প্রসঙ্গ, বিস্তারিতভাবে এ আলোচনায় প্রযোজ্য নয়-উন্নত পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলিতে মাধ্যম-সংস্কৃতি এবং পশুপাখী সম্পর্কিত কি ধারা বর্তমানে চলছে, কিংবা আরো বিস্তারিতভাবে আলোচনা সম্ভব এমন ক্ষেত্র যেমন- অন্যান্য মাধ্যমগুলির ক্ষেত্রে কাল্পনিক উপস্হাপনায় পশুপাখীর জগৎ প্রভৃতি। ভারতের প্রেক্ষিতে এই মাধ্যম-সংস্কৃতিকে সমাজবিজ্ঞানের একটি ধারা হিসেবে ধরে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এর গভীর থেকে গভীরতর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব কি হতে চলেছে বা হতে পারে সে সম্পর্কেও গবেষণার পরবর্তী অবকাশ রয়েছে। এই প্রবন্ধে মূলত সাধারণভাবে যে তথ্যগুলি পাওয়া গেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে তার ওপর ভিত্তি করে একটা সার্বিক চিত্রকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিষয়কে যদি সমীক্ষার জন্য বিভিন্নভাগে ভাগ করা হয় যেমন- শহর-মফস্বল এবং গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে কোন-কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের, নির্দিষ্ট পেশার, নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক তথা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মানুষ এবং সেই ভাগে বিভক্ত পরিবারের শিশুরা কোন-কোন ধরণের পশুপাখী সম্পর্কিত (কাল্পনিক এবং বাস্তবিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে উপস্হাপনা) অনুষ্ঠান দেখছে, তারা কী ভাবছে, তাদের কাছে বাস্তব চরিত্রগুলি সম্বন্ধে ধারণা কীরকম, তারা এ সম্বন্ধে কী কাজ করতে চায় বা আদৌ চায় কিনা প্রভৃতি সম্বন্ধে তথ্য জোগাড় করে বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে ভারতের মাধ্যম-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক পরিমন্ডলের ক্ষেত্রে আগামী দিনে আমাদের ভূমিকা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা দিশা পাওয়া হয়তো সম্ভবপর হবে। বিদেশে এ বিষয়ে অনেক বিস্তৃতভাবেই ইতিমধ্যেই কাজ হয়েছে এবং হচ্ছেও। কিন্তু ভারতের জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমে পশুপাখীর জগৎ এবং সামাজিক যোগসূত্রের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত বিশেষ গবেষণার কাজ হয়নি। বা হলে-ও তা ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। ফলে এই আলোচনার বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখিত স্হির বা পরিবর্তনশীল উপাদানগুলির উপস্হিতি এবং অনুপস্হিতির মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে আরো বিশ্লেষণমূলক কাজ করার সম্ভাবনা দেখতে পাই।

পুনশ্চবা

(১) ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ – মাধ্যম বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহান এই ধারণার জন্ম দেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি যখন সময় এবং ভৌগোলিক ব্যবধান মুছে দিচ্ছে, তখন বিশ্বের মানুষ একই সময়ে একই ঘটনা দেখতে পাচ্ছে। ফলে বিশ্বের মানুষ ‘মাস’ (Mass)-এ পরিণত হচ্ছে। ফলে মানুষের সাথে মাধ্যমের যোগাযোগে আমাদের নিজ সত্ত্বাভিত্তিক চিন্তাধারার-ও পরিবর্তন ঘটছে।

(২) ডেনিস ম্যাকওয়েল হলেন, বিংশ শতকের সারা পৃথিবীর ক্ষেত্রে জ্ঞাপন-সম্পর্কিত তত্ত্বের প্রবর্তন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাক্তিত্ব। জ্ঞাপনের নানান তত্ত্ব, তার বিশ্লেষণ, সামাজিক-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জ্ঞাপন তত্ত্বের প্রযোজ্যতা ও তার গুরুত্বের বিষয়ে ম্যাকওয়েলের অনেক বই আমাদের কাছে বিশেষ মূল্যবান।

 (৩) ডর্ফম্যান, এ্যারিয়েল ও মাতেলার, আরুমঁ। “হাউ টু রীড ডোনাল্ড ডাক: ইম্পিরিয়ালিষ্ট আইডিওলজি ইন্দ্য ডিজনিকমিক” । ইন্টারন্যাশনাল জেনারেল এডিশন, নিউ ইয়র্ক, ১৯৭৫।

 

তথ্যসূত্র:

1. Allee, W. C. The Social Life of Animals. London: William Heinemann Ltd.

2. Darwin, Charles. Ed. By Francis Darwin. “The Expression of the Emotions: Man and Animals”. London, 1882.

3. Delmont, Joseph. Wild Animals on the Films. London: Methuen and Co. Ltd., 1952, First pub.

4. Basu, Durga Das. Law of the press in India. Prentice Hall of India, 1980.

5. Molloy, Claire. Popular Media and Animals. Animal Ethics Series. England: Palgrave Macmillan, 2011.

5. Moore, Alison. “Representation of the Laboratory Animal in popular Media Forms”. Humanities Research Center. 16TH Feb, 2011. University of Lincoln. Sep. 2013.

< eprints.lincoln.ac.uk/4110/1/Lab_Animal_Lincoln_Repository.pdf >.

6. Reesink, Marten. “Animals and human(e) culture” 8th May, 2013. Animals Studies. Sep’2013.

 < www.animalstudies.nl/wp-content/…/Animal-Studies-2013-lecture-5a.pdf>.

7. Malmud, Randy. “Animals on Film: the Ethics of the |Human Gaze”. Sep’, 2013.

< www.english.gsu.edu/pdf/Spring.pdf>.

8. McHugh, Susan. “Modern Animals: From Subjects to Agents in Literacy Studies”. a journal of human/animal studies. Volume 1, Number 1 – September 2009. Society & Animals, Journal of Human-Animal Studies. 16th Sep’2013.

< http://www.depauw.edu/humanimalia/issue01/mchugh.html>.

9. Hirata, Yukie. “The Condition of India Animation Industries between Global Economy and Local Culture”. Asian Culture Industries, Report for CSCS. Sep’, 2013.

<www.asiancultureindustries.files.wordpress.com/…/the-condition-of-indian-ani…>.

10. রায়, সুজিত। সংবাদ সাংবাদিক সাংবাদিকতা। ভারতী সাহিত্য প্রকাশনী। কলকাতা। ১৯৯৯।

11. সিংহ, দীপঙ্কর। সম্পাদক – হোতা, দিব্যেন্দু। মিডিয়াসংস্কৃতি। দে’জ পাবলিশিং। কলকাতা।২০০৩।

12. ভৌমিক, সোমেশ্বর। মিডিয়া নিয়ে স্যাতপাঁচ | গাঙচিল। কলকাতা। ২০০৮ |

13. রায়চৌধুরী, বিশ্বজিৎ| ভারতের বন্যপ্রাণী ও অভয়ারণ্য| ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট। ইন্ডিয়া। ২০০২। প্রথম সংস্করণ |

14. “History of Comics In India”. IndiaNetzone India Literature. (22/12/2009). 04th August, 2013. <http://www.indianetzone.com/41/history_comics_india.htm/>.

 15. “Indian Comics Magazine”. IndiaNetzone India Literature. (29/11/2011). 04th August, 2013. <http://www.indianetzone.com/57/indian_comics_magazines.htm/>.

16. “Indian Comics Creators, Indian Comics”. IndiaNetzone India Literature. (24/11/2011).  04th August, 2013. <http://www.indianetzone.com/57/indian_comics_creators.htm/>.

17. “Characters in Indian Comics Series”. IndiaNetzone India Literature. (29/11/2011). 04th August, 2013. <http://www.indianetzone.com/57/characters_indian_comics_series.htm/>.

18. “Mythical Characters in Indian Comics”. IndiaNetzone India Literature. (15/07/2013). 04th August, 2013. <http://www.indianetzone.com/67/mythical_characters_indian_comics.htm/>.

19. “Indian animation industry”. Wikipedia. 16th September 2013, Wikimedia Foundation, Inc. 04th August, 2013. <http://en.wikipedia.org/wiki/Indian_animation_industry#List_of_animated_TV_series_produced_in_India/>.

20. “Indian animated films”. Wikipedia Category. 21st March 2013. Wikimedia Foundation, Inc.  04th August, 2013 <http://en.wikipedia.org/wiki/Category:Indian_animated_films/>.

21. “Entertainment”. Wikipedia Category. 5th September 2013. Wikimedia Foundation, Inc. 04th August, 2013. <http://en.wikipedia.org/wiki/Entertainment/>.

22. “Animal welfare and rights in India”. Wikipedia. Category. 29th June 2013. Wikimedia Foundation, Inc. 04th August, 2013. <http://en.wikipedia.org/wiki/Category:Animal_welfare_and_rights_in_India/>.

23. “Animals Used for Entertainment”. PeTAINDIA. 04th August, 2013. <http://www.petaindia.com/issues/animals-in-entertainment/>.

24. “Popular Articles About Indian Animation: Indian animation industry faces several challenges”. The Economic Times. February2, 2008, PTI. 25th August, 2013. <http://articles.economictimes.indiatimes.com/keyword/indian-animation/>.

25. “If it’s animation, it must be India!” rediff.com. 19th September, 2013. <http://www.rediff.in/money/2005/mar/16spec1.html/>.

26. “Indian Television Industry” Indian Mirror. 02nd September, 2013. <http://www.indianmirror.com/indian-industries/television.html/>.

27. “Chapter 4 Media Watcher !” How to Do Animal Rights. Roger Panaman (Ben Isacat), 2008. First published on the Web: April 2008.   20th August, 2013. <http://www.animalethics.org.uk/i-ch4-7-media-watcher.html/>.

28. Introduction to the Social Media Networks for Animal Rescuers”. Musings of a Feline Foster Dad: Thoughts and Ideas inspired by Cats. <http://felinefosterdad.wordpress.com/2013/07/26/introduction-to-the-social-media-networks-for-animal-rescuers/>.

পৃথ্বী সেনগুপ্ত,স্বাধীন গবেষক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত. Email: prithwisengupta@yahoo.co.in